পবিত্র বেদ এ বলিপ্রথা নেই বরং পশুরক্ষা ও সাত্ত্বিক আহারের বিধান রয়েছে। সনাতনধর্মের প্রধান ও সর্বোচ্চ প্রমাণিক ধর্মগ্রন্থ বেদ। তাই একজন সনাতনী হিসেবে বেদোক্ত নির্দেশ আমাদের অবশ্যই মান্য।
যারা পূজাতে পশু বলি দেন বা মানেন তাদের বলছি,
আপনি কোরবানিতে পশুপ্রেম দেখান কিন্তু বলির বেলাতে সেই প্রেম দেখান না কেন?
গরুর প্রতি প্রেম দেখান অথচ ছাগল, মহিষ এরা কি পশু না ?
সারাজীবন বলবেন মদ খাওয়া নিষিদ্ধ আর পূজা এলে বলবেন দেবীকে সুরা দিতে হবে পূজা করে সুরাপান বিহিত ।
★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★
(মহাঃ শান্তি পর্বঃ ২৬৫ শ্লোক ৯)
অর্থঃ সুরা, মৎস, মধু, মাংস, তালরস, স্বাগু এইসব বস্তুকে ধুর্তেরাই যজ্ঞে প্রচলিত করেছে। বেদে এসব উপযোগের বিধান নেই।
(মহাঃ শান্তি পর্বঃ অঃ ২৬৫, শ্লোক ৪)
অর্থঃ যে ধর্মের মর্যাদা থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে মূর্খ, নাস্তিক তথা যার আত্মা সংশয়যুক্ত এবং যার কোন প্রসিদ্ধি নেই এইরূপ লোকই হিংসাকে সমর্থন করে।
(মহাঃ শান্তি পর্ব, অঃ ২৬৫, শ্লোক ১০)
অর্থঃ সেই ধূর্তেরা অভিমান, মোহ এবং লোভের বশীভূত হয়ে সেই সব বস্তুর প্রতি লোলুপতা প্রকট করে থাকে।
(মহাঃ শান্তি পর্ব, অঃ২৭২, শ্লোক ১৮)
অর্থঃ আমি সেই পশু কে বধ করে স্বর্গলোক প্রাপ্ত করবো। এই ভেবে মৃগকে হিংসা করার জন্য উদ্যত সেই ব্রাহ্মণের মহান তপস্যা তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই জন্য হিংসা যজ্ঞের জন্য হিতকর নয়।
★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★
বেদ এ স্পষ্ট আছেঃ–
(অথর্ববেদ ১০।১।২৯)
অর্থাৎ হে হিংসক্রিয়ে, নিরপরাধ হত্যা নিশ্চিতভাবে এর ভয়ংকরপ্রদ] অতএব নিরাপরাধ পশুদের নিরন্তর রক্ষা করো।
হে পুরুষ! এই হর্ষধ্বনি কারী, যা সব প্রকার কষ্ট সহনের সামর্থ্য এক ক্ষুরযুক্ত বেগবান,যা সংগ্রামপযোগী পশুদের মধ্যে সবচেয়ে অধিক বেগবান অশ্ব, গাধা, খচ্চর আদি পশুকে মেরো না। জঙ্গলে গৌর নামক পশু কে লক্ষ্য করে তোমাকে আমি এই উপদেশ করছি যে, তাদের বৃদ্ধিতে তুমি নিজেকেও বৃদ্ধি করে নিজ শরীর কে রক্ষা করো। তোমার শোক, সন্তাপ বা ক্রোধ সেই গৌর নামক ক্ষেতের হানিকারক মৃগের প্রাপ্ত হোক।যাদের প্রতি আমাদের প্রীতি নেই, তোমার শোক সন্তাপ বা ক্রোধ তাদের প্রাপ্ত হোক।
(অনুবাদঃ জয়দেব শৰ্মা)
আকাশ অন্তরীক্ষের মধ্যে বিবিধ প্রকারে বিস্তার কারী শত ধারা বর্ষনকারী আশ্রয়, সোমরূপ মেঘের সমান লোক মধ্যে বিদ্যমান শতজনের ধারক পোষক এবং হাজারো সুখপ্রদ পদার্থের উৎপাদক এই বৃষ কে এবং মনুষ্যের হিতের জন্য ঘী, দুগ্ধ, অন্ন আদি পুষ্টিকারক পদার্থ প্রদানকারী অহিংসনীয়, পৃথিবী সমান গাভী কে, হে রাজন! আপন সর্বোৎকৃষ্ট স্থান মধ্যে বা আপন রক্ষন কার্যের মধ্যে তৎপর হয়ে মেরো না। তোমাকে আমি বন্য পশু গবয় এর উপদেশ করি। উহা দ্বারা নিজ ঐশ্বর্য কে বৃদ্ধি করে নিজ শরীরকে স্থির করো। তোমার শোক সন্তাপ বা ক্রোধ "গবয়" নামক পশুর প্রাপ্ত হোক। এবং যেই শত্রুকে দ্বেষ করি, তোমার সন্তাপ এবং পীড়াদায়ক ক্রোধ তাহার প্রাপ্ত হোক।
হে রাজন! তুমি পরম সর্বোচ্চ "ব্যোম" অর্থাৎ বিবিধ প্রাণীদের রক্ষাধিকারে নিযুক্ত হয়ে সর্ব জগতের রচয়িতা পরমেশ্বর কে প্রজাদের সবার উত্তম বা সবার সবার আদি উৎপাদক কারণ, মেঘের সমান সুখের উৎপাদক, বরুন অর্থাৎ বরণ করার যোগ্য সুখের মূল কারণ দ্বিপদী এবং চতুষ্পদী পশুদের মধ্যে শরীরকে লোম আদি দ্বারা আবৃতযুক্ত এই " ঊর্নায়ু " উল প্রদানকারী মেষ আদি জীবকে মেরো না। তোমাকে আমি বন্য উট এর উপদেশ করি। উহা দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে শরীরের সুখকে প্রাপ্ত করো। তোমার পীড়াজনক প্রবৃত্তি, দাহকারী পীড়দায়ক জীবের প্রাপ্ত হোক।এবং তোমার দুঃখদায়ী ক্রোধ তাহার প্রাপ্ত যাদের আমরা দ্বেষ করি।
(অনুবাদঃ জয়দেব শর্মা)
(অথর্ববেদ ৮।৩।১৫)
অর্থাৎ, যে দুঃখদায়ী জীব পুরুষ বধ দ্বারা প্রাপ্ত মাংস দ্বারা যে ঘোড়ার মাংস এবং পশু দ্বারা নিজেকে পুষ্ট করে এবং যে হত্যার অযোগ্য গাভীর দুধকে নষ্ট করে হে অগ্নি তাহার শির কে নিজের বল দ্বারা ছিন্ন করো।
অর্থাৎ, হে সহস্র প্রকার দৃষ্টি যুক্ত রাজন! সুখ প্রাপ্ত করানোর জন্য নিরন্তর বৃদ্ধিশীল এই দ্বিপদী মনুষ্য এবং পশুকে হত্যা করো না।
(ঋগ্বেদ ৮।১০১।১৫)
অর্থাৎ, হে জ্ঞানবান পুরুষের নিকট আমি বলেতেছি
নিরপরাধ অহিংস পৃথিবী সদৃশ গাভীকে হত্যা করিও না।
(অথর্ববেদ ১।১৬।৪)
অর্থাৎ, যদি আমাদের গাভীকে হিংসা কর যদি অশ্বকে যদি মনুষ্যকে হিংসা কর তবে তোমাকে সীসক দ্বারা বিদ্ধ করিব যাহাতে আমাদের মধ্যে বীরদের বিনাশক কেহ না থাকে।
(অথর্ববেদ ১০।১।২৯)
(যজুর্বেদ ৩০।১৮)
অর্থাৎ, গাভীর ঘাতক অর্থাৎ হত্যাকারী যে, ক্ষুধার জন্য গাভীকে হত্যা করে। তাকে দূর করি।
(যজুর্বেদ ১৩। ৪৯)
অর্থাৎ, হত্যার অযোগ্য গাভীকে কখনো মেরো না।
(ঋগ্বেদ ৮।১০১।১৫)
অর্থাৎ, নিরপরাধ গাভী এবং ভূমিতূল্য গাভীকে কখনো বধ করো না।
(অথর্ববেদ ১১।৭।৭)
অর্থাৎ, রাজসূয়, বাজপেয়, অগ্নিষ্টোম এইসব যজ্ঞ অধ্বর অর্থাৎ হিংসারহিত। অর্ক এবং অশ্বমেধ যজ্ঞ প্রভূর মধ্যে স্থিত, যাহা জীবের বৃদ্ধিকারী এবং অতন্ত্য হর্ষদায়ক।
(ঋগ্বেদ ১।১।৪)
অর্থাৎ, হে পরমেশ্বর যে অধ্বর অর্থাৎ হিংসা রহিত যজ্ঞকে সর্বত্র ব্যাপক হয়ে সব প্রকারে পালনকারী। এই হিংসারহিত যজ্ঞে বিদ্বান লোক সুখ প্রাপ্ত করে।
(অথর্ববেদ ৬।১৪০।২)
অর্থাৎ, হে দন্ত! অন্ন খাও যব খাও মাষ কালাই এবং তিল খাও তোমার এই ভাগ উত্তম পদার্থ ধারনের জন্য স্থাপন করা হয়েছে হে দন্ত! পিতা ও মাতাকে হিংসিত করো না [মাংসাহার থেকে দূরে থাকো
এবং বেদ মন্ত্রে সেই পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে যে, আমাদের দন্ত যেন ব্যাঘের ন্যায় না হয়। কারন বাঘের দন্ত সর্বদা মাংসাহার করে থাকে। সে জন্য আমাদের দন্ত কে ব্যাঘ্রের ন্যায় না করে কল্যাণকারী করো।
(অথর্ববেদ ৬।১৪০১)
অর্থাৎ, যে দন্ত ব্যাঘ্রের ন্যায় পিতা ও মাতাকে খাওয়ার জন্য চেষ্টা করে সেই দাঁত কে হে সর্বব্যাপক জ্ঞানের পরিপালক কল্যাণকারী করো।
সুতরাং, যেখানে পশু রক্ষার কথা বলা হয়েছে সেখানে পশুবলি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সনাতনধর্মে পশুবলি নামক কুসংস্কার দ্বারা প্রাণীহত্যা সম্পূর্ণ নিষেধ।
★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★
(অথর্ববেদ ৬।১৪০।২)
অর্থাৎ, চাউল, যব, মাষ এবং তিল ভক্ষণ কর। রমণীয়তার জন্য ইহাই তোমাদের জন্য বিহিত হইয়াছে! পালক ও রক্ষককে ভক্ষণ করিও না।
(অথৰ্ববেদ ১৯/৩/১৫)
অর্থাৎ, চতুস্পদ পশু, দ্বিপদ পশু এবং ধান্য হইতে আমরা পুষ্টি গ্রহণ করি। এজন্য সৃষ্টি কর্তা পরমেশ্বর আমাদিগকে পশু দুগ্ধ ও ঔষধির রস প্রদান করিয়াছেন।
ইন্দ্রো হ ব্রহ্মচর্যেণ দেবেভ্যঃ স্ব রা ভরৎ।।
[ অথর্ববেদ: ১১/৫/১৯ ]
অর্থাৎ, ব্রহ্মচর্যরূপ তপস্যা দ্বারাই জ্ঞানীরা মৃত্যুকে জয় করেন এবং ব্রহ্মচর্য দ্বারাই জীবাত্মা ইন্দ্রিয়গনকে তেজ দান করিতে পারে।
[ সৎকর্ম, সৎসঙ্গ, সাত্ত্বিক আহার, প্রাণায়াম উপাসনা এবং যজ্ঞকর্ম।।
এবং কাম, ক্রোধ, হিংসা, অহংকার, মোহ না করা। ]
অর্থাৎ বেদ আমাদের সর্বদাই কল্যাণকারী হওয়ার প্রেরণা দিচ্ছেন। যাতে করে আমাদের কাছ থেকে কেউ যেন কষ্ট না পায়। আমরা যেন নিরীহ প্রাণীদের হিংসা না করি।
সুতরাং, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, পবিত্র বেদ এ বলিপ্রথা বিধান তো নেইই বরং পশু রক্ষার কথা বলা হয়েছে এবং সাত্ত্বিক আহারে মনোনিবেশ করতে বলা হয়েছে।


No comments:
Post a Comment