হিংসাত্মক কর্মকে বর্জন করুন - সন্তবন্ধু মিলন রবিদাস

টপ পোষ্ট

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Thursday, November 16, 2023

হিংসাত্মক কর্মকে বর্জন করুন



নসা পূজা বা কালীপূজা আসলেই পশুব'লি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদে ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। এতে শাস্ত্র জানা মানুষেরা তর্ক-বিতর্ক করে নিজেদের মতকে প্রতিষ্ঠা করলেও শাস্ত্র না জানা মানুষেরা বিভ্রান্তিতে পড়ে। ফলে সনাতন ধর্ম দর্শনের উপর সন্দেহ ঘনিয়ে আসে। কারণ সাধারণ মানুষ ধর্মটাকে সাধারণভাবে, সহজভাবে গ্রহণ করতে পারলেই খুশি। তারা কেবল এটি চায় যে, কোনটি ঠিক? যা ঠিক তা পালন করবে। কিন্তু এই ঠিক-বেঠিক নির্ণয় করার জন্য যেসকল শাস্ত্রজ্ঞ রয়েছেন তাদের মধ্যেই রয়েছে মতভেদ। অবশ্য আমি তাদের দোষ দিব না, কালের পরিক্রমায় সনাতন ধর্মদর্শনে এত এত গ্রন্থ প্রবেশ করেছে যে ঠিক-বেঠিক নির্ণয় করাটা একটু দুঃসাধ্য বটে। এই অবস্থায় প্রথম প্রয়োজন হয় সনাতন ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থের, এবং অন্তিমে প্রয়োজন হয় একজন তত্ত্বদর্শী আচার্যের। যিনি সেই পরমকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

একটু নোট করুন, আমরা বর্তমানে এগুলো পাচ্ছি কি না?
সনাতন ধর্মে পশুব'লি সিদ্ধ না কি নিষিদ্ধ, তা নিয়ে আলোচনার জন্য আজ শাস্ত্রের পৃষ্ঠা খুলব না৷ আমি খুব সহজ করে কিছু কথা লিখব। ভালো না লাগলে এড়িয়ে যাবেন।
অহিংসা পরম ধর্ম। এখানে অহিংসা হচ্ছে জীবের হ'ত্যা না করা। পৃথিবীতে যত জীব রয়েছে তার মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ। কারণ শুভ-অশুভ, ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক নির্ধারণের জ্ঞান তার রয়েছে। সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা রয়েছে তা হলো পরমকে উপলব্ধি করার শক্তি, যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। এই পরমকে উপলব্ধির জন্য সর্বপ্রথম নিজেকে তৈরি করার জন্য যে বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হয় তা হলো ইন্দ্রিয় সংযম৷ লোক দেখানো বাহ্যিক ত্যাগ নয়, অভ্যন্তরীণ কামনা-বাসনার ত্যাগ। অভ্যন্তরীণ ত্যাগের ফলে বাহ্যিক ত্যাগ আসলে তবেই সেটি ধর্মের সূত্রে ত্যাগ। কিন্তু বাহ্যিক ত্যাগ করে অন্তরে কামনার লালসা থাকলে তা ত্যাগ নয়।
নোট করুন, আপনি এরূপ ত্যাগ করতে পেরেছন কি না?
জীব মাত্রই ভালোবাসার প্রাণী। সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে তাদের লালন-পালন করা, তাদেরকে ভালোবাসা আমাদের কর্তব্য। পরম মমতায় জীবের লালল-পালন করে তাকে হ'ত্যা করতে আপনার অন্তরে কি একটুও কষ্ট লাগবে না? যদি লাগে তাহলে সেই হ'ত্যা কেন? আপনি বলতে পারেন, হিংস্র প্রাণীদের আমরা হ'ত্যা করি, এটাও তো হ'ত্যা। হ্যাঁ, এটাও হ'ত্যা। কিন্তু বৃহৎ স্বার্থে, পরিবার বা সমাজের রক্ষার্থে এইরূপ সিদ্ধান্ত আপনাকে নিতে হবে। তবে সেই হত্যাযজ্ঞে ক্রোধ থাকবে না। এটা আপনার কর্তব্য মনে করে এই কার্য করতে হয়। এই নীতির উপর নির্ভর করেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন গাণ্ডীব ধারণ করেছিলেন। সুতরাং হিংস্র পশুর হ'ত্যা আর নির্দিষ্ট দিনে হাজার হাজার নিরীহ প্রাণীর হত্যা করে আনন্দ করা কখনো এক নয়।
নোট করুন, আপনি কোনটা করছেন?
আমাদের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রায় ৬৫% মানুষ মাংস আহার করে। আমরা জানি এটা পাপ, কিন্তু তবুও আহার করি। কেন? কারণ আমরা ইন্দ্রিয় সংযম করতে সমর্থ হইনি। দোষটা আমাদের, ঈশ্বরের নয়। জীবন ধারণের জন্য প্রাণী হ'ত্যা করতেই হবে বা মাংস আহার করতেই হবে, এমনটা কখনোই নয়। প্রায় সব-কটি গবেষণায় এটি উঠে এসেছে যে, একজন মানুষের জীবন ধারণের জন্য মাংসের কোনো প্রয়োজন নেই। তবে হ্যাঁ, অসুস্থতার ব্যপার ভিন্ন। এখানে আপদকালীন ধর্মের প্রয়োগ হবে। আপনি বলতে পারেন যে, পশুর যেমন প্রাণ আছে, ঠিক তেমনি উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে। তাহলে উদ্ভিদ আহার করলেও প্রাণের হত্যা হচ্ছে। এখানে আপনাকে বলে রাখি, উদ্ভিদের প্রাণ আছে কিন্তু অনুভূতি নেই। অনেকটা আপনার মাথার চুলের মতো। বৈদিক শাস্ত্রে মানুষের জন্য এই আহার নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রাচীন মুনি-ঋষিগণ উপলব্ধি করেছিলেন যে এই আহার ইন্দ্রিয় সংযমের ক্ষেত্রে সহায়ক এবং শরীরের সুস্থতা ধরে রাখতে পারে।
নোট করুন, আপনি কোনটা বেছে নিয়েছেন?
পশুহ'ত্যা হিংসা এবং অধর্ম-এটা আমরা সকলেই স্বিকার করি। কিন্তু দেবতার উদ্দেশ্যে পশুহ'ত্যা অহিংসা। কোথায় আছে? পুরাণাদি বা তন্ত্রে। আপনি সম্পূর্ণরূপে এগুলো মান্য করেন তো? কখনো এগুলো খুলে দেখেছেন ভেতরে কী পরিমাণ অনাচা'র রয়েছে? যদি সবটুকু মান্য করতে বলা হয় তাহলে পারবেন তো? যদি মান্য করেন তাহলে পাঠাব'লির সাথে গোরু এবং মানুষ ব'লিও দিন। কারণ এই গ্রন্থগুলো অনুসারে পাঠাব'লির চেয়ে গোরু বা মানুষ ব'লিতে পূণ্য বেশি। যে শাস্ত্রের তালিকা প্রকাশ করে পাঠাব'লি দিতে চাচ্ছেন, ঠিক একই শাস্ত্রের অনুকূলে গোরু/মানুষ বলি দিতে পারবেন তো?
নোট করুন, আপনি কোন সিদ্ধান্ত নিবেন?
শাস্ত্রের জ্ঞান, তর্ক-বিতর্ক করে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করার স্থান এই পৃথিবী। প্রতিটি মানুষের উদ্দেশ্য কী? সেই পরমকে উপলব্ধি করা, তার অনন্দকে প্রাপ্ত করা৷ আজ শাস্ত্রের নাম করে প্রাণী হ'ত্যাকে অহিংসা বলছেন, কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো প্রাণীর প্রা'ণটুকু জোর করে শাস্তি দিয়ে কেড়ে নিচ্ছেন, সেই আপনার উপর পরমের আশীর্বাদ বর্ষিত হবে তো? জেনে রাখুন, নিজের উদর তৃপ্তি আর পরমের সাধনা এক নয়। আজ শাস্ত্রের নামে বৈধতা দিয়ে যে পশুর হ'ত্যাকে সাপোর্ট করছেন, সেই আপনি পরমের কাছে বলতে পারবেন তো যে, আপনি এইসমস্ত শাস্ত্রে পশুহ'ত্যা অহিংসা পেয়ে সমাজে বৈধতা দিয়েছিলেন? পারবেন না। কেন জানেন? কারণ আপনি পরমকে উপলব্ধিই করতে পারবেন না৷ প্রথমত, ইন্দ্রিয়ের লালসা ত্যাগ করতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, সাধনার জন্য যে স্থির চিত্তের প্রয়োজন তা আপনার হবে না। কারণ মাংসের প্রভাবে আপনার প্রকৃতি ক্রমশ রজোগুণাত্মক তমঃকে প্রাপ্ত করবে। অথচ পরমকে প্রাপ্তির জন্য সত্ত্বঃগুণকেও ছাড়িয়ে যেতে হয়। যখন সেই নৈর্গুণ্য অবস্থায় পৌঁছাতে পারবেন তখন আর পরমের কাছে বলতে হবে না যে, আপনি পুরণ বা তন্ত্রে পশুব'লির বৈধতা থাকায় পশুহ'ত্যা করে মাং'স আহার করেছিলেন। কেননা, যখন আপনার প্রবৃত্তি নৈর্গুণ্য অবস্থাকে প্রাপ্ত করবে তখন কোনটি ধর্ম আর কোনটি ধর্মের নামে লালসা পূর্তির হিংসা সেটা নিজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।
নোট করুন, আপনি কোনটা চান?
প্রতিটি জীবের অন্তিম উদ্দেশ্য এক। সেই পরমকে প্রাপ্ত করা। মনে রাখবেন, এই রাস্তায় আপনি সম্পূর্ণ একা। আপনার সাধনাই আপনার রাস্তা। সাধনায় যতটা ফাঁকি আপনি দিবেন, ঠিক ততটাই আত্মার অধঃপতন ঘটবে। যতটা সম্ভব শুদ্ধ ধর্মকে ধারণ করতে পারবেন, ততটাই আত্মার উন্নতি হবে। যে শাস্ত্র দেখিয়ে মাংসাহা'রের বৈধতা সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, সেইসকল শাস্ত্র বেদের নিকট ভ্যালুলেস। এবার আসল কথা বলি, আপনার অন্তিম গন্তব্যে পৌঁছাতে এই সুপ্রিম বেদেরও উপরে উঠতে হবে। এই যে মুক্তির চেষ্টা তা কেবল আহার-বিহারে সীমাবদ্ধ নয়, যুক্তিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়, অন্তরে যখন সব কিছুই সৎ হবে, তখন সেটিই হবে সাধনার প্রথম সোপানে পাঁ দেওয়া।
জীবন আপনার, মুক্ত হওয়ার চিন্তা আপনার, সুতরাং ঠিক-বেঠিক নির্ণয় করার দায়িত্বটাও আপনার। মনে রাখবেন, আপনার মুক্তির জন্য সাধনা আপনাকেই করতে হবে। এই পথে আপনি কাউকেই পাশে পাবেন না। যতটা ছল আপনি করবেন, তা নিজের সাথেই করবেন। যতটা ধর্মকে ধারণ করবেন, তা নিজের আত্মশুদ্ধির জন্যই ধারণ করবেন। সেই আত্মশুদ্ধির প্রথম পদক্ষেপ হবে যেকোনো প্রকার হিংসাত্মক কর্মকে বর্জন করে অন্তরের শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠা। ভালো থাকুন। নমস্কার।

- তুষার কান্তি সরকার

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad

Responsive Ads Here