বর্তমানের উপাসনা - সন্তবন্ধু মিলন রবিদাস

টপ পোষ্ট

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Tuesday, December 5, 2023

বর্তমানের উপাসনা

 




আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে লিখতে বসেছি ৷ লেখাটা একটু বড় হবে হয়তো, সবাই দয়াকরে পড়বেন পুরোটা ৷

জগন্নাথ হলে থাকার সুবাদে মাঝে মাঝে সময় পেলে আমি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে যাই ৷ ওখানে গিয়ে বেশিরভাগ সময়েই যা দেখি তা হলো, পূজারী/পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক সপ্তাহের বিভিন্ন দিন বা দিনের বিভিন্ন সময় ভেদে বিভিন্ন দেবতার পূজা করছেন আর তার পেছন দিকটায় বসে অনেক মানুষ তাদের নিজেদের মতো সময় অতিবাহিত করছে ৷ নিজেদের মতো বলতে আমি বুঝাতে চাচ্ছি, কেউ নিজের ফোন টিপছে বা ফোনে কথা বলছে, কেউ চুপিসারে গল্প করছে, কেউ মোমবাতি/আগরবাতি প্রজ্জ্বলন করছে, কেউ আনমনে ঐ পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে আছে আর কেউবা উশখুশ মনে প্রসাদ পাবার প্রহর গুনছে ৷ এদের অধিকাংশই জানে না যে, সেদিন যে পূজা হচ্ছে, তার উপকারিতা/আবশ্যকতা কী; পুরোহিত যে মন্ত্র/শ্লোকগুলো উচ্চারণ করছেন, সেগুলোর বাংলা অর্থ আর তাৎপর্যই বা কী ৷ একজনের দেখাদেখি আরেকজনও উপরে ঝুলানো ঘণ্টাটায় জোরসে একটা শব্দ করে ভেতরে প্রবেশ করে আর পূজা শেষে আগেভাগে প্রসাদ পাবার জন্য শুরু করে ঠেলাঠেলি, ঢাক্কাঢাক্কি ৷ রমনা কালী মন্দিরেও একই অবস্থা ৷ কেউ মোমবাতি/আগরবাতি জ্বালাচ্ছে, কেউ ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখছে আর কেউ দানবাক্স/দক্ষিণা নিয়ে ব্যস্ত ৷
এ তো গেলো মন্দিরের গল্প ৷ আমি বাসাবাড়িতেও এর ব্যতিক্রম কিছু খুঁজে পাই না ৷ বিভিন্ন পর্বে বিভিন্ন পূজায় পুরোহিত সবার সামনে বসে অনর্গল মন্ত্র পাঠ ও ঘণ্টাধ্বনির দ্বারা পূজা সম্পন্ন করে দান-দক্ষিণা নিয়ে চলে যান, আর পেছনে বসে বাড়ির মহিলারা শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি দিয়ে সে পূজায় শরিক হয় ৷ এক্ষেত্রে পুরুষদের কথা না হয় না-ই টানলাম, কারণ সেটা আরো বেশি লজ্জার ৷ আমার দৃষ্টিতে এ কেবল পাশে থাকা, কিন্তু মিশে যাওয়া নয়, একীভূত হওয়া নয় ৷ এরূপ অভিনয় অনুধাবন থেকে বহুদূরে অবস্থিত ৷ মাঝে মাঝে দেখি, অঞ্জলি প্রদানের সময় পুরোহিত দু-চারটি শ্লোক বলেন আর পেছনের সমবেত জনতা তোতাপাখির মতো তা আবৃত্তি করে ৷ এদের অধিকাংশই জানে না, এরা কী বলছে; এসব শ্লোকের কী অর্থ, কী গুরুত্ব, কী তাৎপর্য ৷
আমার অনেক কাছের বন্ধু/বান্ধবীকে দেখেছি, যারা এই বয়সে এসেও জানে না আমিষ আর নিরামিষ খাবার কী জিনিস; ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত সাত্ত্বিক, রাজসিক আর তামসিক খাবারের কথা না হয় বাদই দিলাম ৷ অনেক কাছের আত্মীয়-স্বজনকে দেখেছি, যারা জীবন সায়াহ্নে এসেও ঈশ্বর, দেবদেবী আর মহামানব/মানবীর পার্থক্য বোঝে না; আত্মা-পরমাত্মা তত্ত্ব না হয় বাদই দিলাম ৷ পরিচিত/অপরিচিত এমন অনেককে দেখেছি, যাদের স্বর্গ-নরক বা জন্মান্তরবাদের সাধারণ জ্ঞানটুকু নেই, মোক্ষলাভ বা নির্বাণলাভের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম ৷ গীতা হয়তো অনেকেই পড়ে, কিন্তু তার মূল বক্তব্যের ন্যূনতম ধারণাটুকু অধিকাংশ হিন্দু ব্যক্তি রাখে না, বেদ-উপনিষদের কথাও আমি ছেড়ে দিলাম ৷ এভাবে চোখ বন্ধ করে পরের মুখে উচ্চারিত বুলির পুনঃউচ্চারণ, সাপের মন্ত্রের মতো পাঁচালী পাঠ, প্রসাদের পেছনে দৌড়াদৌড়ি আর দাদা-পরদাদার ধর্মপরিচয়ে ধর্ম আর কয়দিন টিকবে ভাই? সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থার তাগিদে পবিত্র বেদ ও গীতায় বর্ণিত মানুষের গুণ, যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মানুশীলনের ভিত্তিতে চমৎকার বর্ণাশ্রমকে ভুলে গিয়ে যে জাতি বল্লাল সেন প্রবর্তিত বংশপরম্পরা, কৌলিন্য ও পদ্দিভিত্তিক ব্যবস্থাকে আকড়ে ধরে নিজেদেরকে বিশৃঙ্খল ও বিভাজিত করেছে, তাদের ভবিষ্যত বাস্তবে কোথায় গিয়ে দাড়াবে??

আজ আমরা মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে জড় আনুষ্ঠানিকতায় বেশি উৎসাহী ৷ অনুধাবন নয়, অন্তর্দৃষ্টি নয়, বরং নকল আর প্রতিযোগিতা করার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সে আনুষ্ঠানিকতা ৷ এলাকার দুর্গাপূজায় কোথা থেকে কী মন্ত্র পাঠ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই, পূজা কমিটিতে কে কোন পোস্ট নেবে, সেটা নিয়ে সবার মাথাব্যাথা ৷ ধর্ম প্রচারের সময় কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না, অথচ আরতি আর প্রসাদ বিতরণের সময় লোকে লোকারণ্য, তখন মন্দিরের একটু কাছে পর্যন্ত ঘেষা যায় না ৷ এখন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে টাকার খেলা চলে, প্রতিমার আঙ্গিকতা, সৌন্দর্য ও সজ্জা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে; কিন্তু ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা বা সমর্পণের প্রয়াস তেমন চোখে পড়ে না ৷ আজকাল পূজায় ডিজে হয়, আরতির নামে অশ্লীল নৃত্য হয়, অবাধ স্বাধীনতার নামে বেহায়াপনা হয়, মন্দিরের পেছনের অন্ধকার গলিতে মদের বোতল জমা পড়ে ৷ আমাদের নবীন সমাজ, তরুণ সমাজ এসব দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে ৷ সবার মাঝে এই ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে যে, এমনই বুঝি সনাতন ধর্ম, এসবই বুঝি তার আচার-আঙ্গিকতা ৷ আমরা কোনোদিন ধর্মের গভীরে ঢুকি না, ঢোকার সুযোগ পাই না ৷ ধর্ম এখন আমাদের কাছে বাপ-দাদার পালন করা ইতিহাসের পাঠ, হাসি-তামাসার উপকরণ ৷ ধর্ম এখন টিভি সিরিয়ালের চলমান গল্প, টক-শোতে তর্কের বিষয়বস্তু ৷ পূজা মানে এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাকা খরচের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, পার্বণ মানে এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক দিন সুযোগের অপেক্ষায় থাকার পর মদ্যপান ও ডিজে পার্টি করার একটা সামাজিকভাবে স্বীকৃত দিন ৷ সেকুলার ভাবধারার অাধিপত্যবাদ সবাইকে জানান দিচ্ছে যে, ধর্ম অতীতকালের অন্ধদের অজ্ঞানতা ৷ সেকুলার সনাতনধর্মীয় ব্যক্তিগণ নিজেদের ধর্মের জায়গায় 'সনাতন' না লিখে 'হিউম্যানিটি' বা 'মানবতা' কথাটা লিখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন ৷ অথচ পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মগ্রন্থের আগে অন্য কোনো গ্রন্থ মানবতার কথা বলেছে বলে আমার জানা নেই ৷
সে যাই হোক, আজকের যে নবীন শিশু এভাবেই ধর্মকে জানতে জানতে বড় হচ্ছে, যার দৃষ্টিতে সনাতন ধর্ম সর্বান্তকরণে এমনতর রঙ্গ-তামাশাতেই সীমাবদ্ধ, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, ভবিষ্যতে কোনো একদিন সে ধর্মান্তরিত/নাস্তিক হবেই ৷ যে জাতি বেদ জানে না, উপনিষদ কোনোদিন চোখে দেখে না, গীতা বোঝে না, পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই সেই জাতির ধর্মান্তর ঠেকায় ৷ আর এই কথা যে কতোটা সত্য, তা চারপাশে তাকালেই বুঝতে পারবেন ৷

তাহলে এ দায়ভার কার? এ দায়ভার আমাদের সিস্টেমের, আমাদের প্রথাগত ব্যবস্থার ৷ আমরা পূজারীর পেছনে বসে তার পূজা করার অভিনয় দেখা আর পূজা শেষে প্রসাদের জন্য প্রহর গুনতে থাকাতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি, ধর্মকে উপলব্ধির চেষ্টা আমাদের কারো নাই ৷ মন্দিরে যাওয়া আমাদের কাছে ফরমালিটি মাত্র, ধর্মগ্রন্থ আমাদের কাছে পূজাঘরে তুলসীপাতাসহ সাজিয়ে রাখার উপকরণ, এর ভেতরে আমরা ঢুকতে পারছি না ৷ এই সিস্টেমটাকে আমাদের পাল্টাতে হবে ৷ কেবল উৎসব-অনুষ্ঠান, নাচ-গান-খাওয়াদাওয়া কিংবা পূজায় ঘুরাঘুরি নয়, ধর্মের মূল বক্তব্যকে আমাদের বুঝতে হবে ৷ ধর্মের মাহাত্ম্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানতে হবে ৷ আর এজন্যই উপরের এতো আলোচনা ৷
এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন মন্দির পরিচালনার সিস্টেমে পরিবর্তন আনা ৷ শুরুতে উদাহরণ হিসেবে ঢাকেশ্বরী আর রমনা কালী মন্দিরের কথা আমি যেমনটা বলেছি, যদি সেখানকার প্রার্থনা কার্যক্রম ওমন না হয়ে বরং প্রতিদিন কোনো এক সময় সমবেত প্রার্থনা, বেদপাঠ, গীতাপাঠ এবং সপ্তাহের অন্তত কোনো একদিন পবিত্র বেদ, উপনিষদ ও গীতার আলোকে ধর্মালোচনার ব্যবস্থা থাকতো, তবে আমাদের সনাতনী সমাজ পুরোহিতের পেছনে বসে মোবাইল ফোন না টিপে বরং ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারতো ৷ সেই ধর্মালোচনায় সনাতনী সমাজের ছোট কিংবা বড়, ধনী কিংবা দরিদ্র, জাত-পাত নির্বিশেষে সকলেই একসাথে যাবে, সেখানে প্রশ্ন করার ব্যবস্থা থাকবে, উত্তর প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে ৷ আপনি বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, এটা নিঃসন্দেহে তোতাপাখির মতো শুনে শুনে মন্ত্র আবৃত্তির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী হবে ৷ এর আরো একটা উপকারিতা আছে ৷ মন্দিরে সব সময়ই হাতে গোনা কিছু মানুষ যায়, সবাই যায় না; অনেকের সময় নাই আবার অনেকের ইচ্ছাও নাই ৷ কিন্তু যখন এরূপ ধর্মালোচনা হবে, ক্ষুরধার সব প্রশ্নের গ্রন্থভিত্তিক উত্তর আসবে, তখন কেউ হয়তো সেটা ভিডিও করবে, সেই ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়বে, বিভিন্ন সনাতন ধর্মীয় গ্রুপে সেটা শেয়ার হবে, সবাই ধর্ম সম্পর্কে জানবে ৷ কেবল ঢাকেশ্বরী বা রমনা কালী মন্দির নয়, সব বড় বড় মন্দিরেই এই ব্যবস্থা চালু করা দরকার ৷ বর্তমানে আমরা যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাতে এরূপ উদ্যোগের কোনো বিকল্প নাই ৷


শেষে আরো একটা কথা বলি ৷ এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়, প্রশংসনীয়, সময়োপযোগী ও যথার্থ হলেও কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে এর বাস্তবায়ন সম্ভব না ৷ এর জন্য প্রয়োজন উপর মহলের সদিচ্ছা বা কোনো সংগঠনের সরাসরি হস্তক্ষেপ ৷ দরকার মন্দির পরিচালনা কমিটির কার্যকরী সিদ্ধান্ত ও বাকী সনাতনী সমাজের একাত্মতা ৷ যারা উপর মহলে আছেন, যাদের এরূপ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বা সামর্থ আছে, দয়াকরে ভেবে দেখবেন বিষয়টা ৷ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের সদস্যরা দয়াকরে একটু এগিয়ে আসুন ৷ আপনাদের একটা সিদ্ধান্তের কারণে হয়তো রক্ষা পাবে সনাতনী সমাজ, তারা আবার নতুন করে জানবে তাদের ধর্ম সম্পর্কে ৷ তারা জড় আনুষ্ঠানিকতা ও অপ্রাসঙ্গিকতা ছেড়ে ফিরে আসবে মূল ধর্মাচরণে, লাভ করবে বেদ ও গীতার সেই মৌলিক, পবিত্র ও অবিনাশী জ্ঞান ৷ আমি সেই প্রত্যাশায় রইলাম ৷ নমস্কার ৷

#Collected

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad

Responsive Ads Here